May 27, 2024, 7:16 am

উপকূলে পানির কষ্ট কমাতে ‘প্রবাহ’

উপকূলে পানির কষ্ট কমাতে ‘প্রবাহ’

সময়টা দুপুরের কিছু আগে। পাঁচ-সাতজন নারী শৃঙ্খলা মেনে সিলভারের কলসিতে পুকুরের পানি ভরছেন। কলসি ভরা শেষে একে একে ফিরছেন বাড়ির পথে। এই দৃশ্য সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার গাবুরার মধ্যম খলশিবুনিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সঙ্গে লাগোয়া সরকারি পুকুরপাড়ের। ওই পুকুরের পাড়েই রয়েছে একটা পন্ড স্যান্ড ফিল্টার (পিএসএফ)। তবে অকেজো।

এই পুকুরের ওপর ভরসা করেন মধ্যম খলশিবুনিয়া, চকবারা, ঢালীবাড়ি, কালীবাড়ি, গাজীপাড়াসহ আশপাশের কয়েক পাড়ার মানুষ। দেড়-দুই কিলোমিটার দূর থেকে নারীরা এখানে আসেন পানি নিতে। অনেকেই আবার একই সঙ্গে দুই কলসি পানি নেন।

পুকুর থেকে পানি নিয়ে ফিরছিলেন সাহিদা বেগম। সাহিদার বাড়ি পুকুরপাড় থেকে দেড় কিলোমিটারের মতো দূরের খোলপেটুয়া গ্রামে। এই পথ পাড়ি দিয়ে দিনে দুইবার পানি নেন তিনি। সাহিদা বলেন, ‘সবকিছুতেই আমাদের কষ্ট। তবে পানির কষ্টটা আর গেল না। আশপাশের সব পানিতে লবণ। এই পুকুরও আইলার সময় ডুবে যাওয়ার পর পানি আগের মতো মিষ্টি নেই। তারপরও চালাতে হয়। সামনে আবার গরম কাল; তখন কষ্টের শেষ থাকবে না।’

শ্যামনগর উপজেলার দ্বীপ ইউনিয়ন গাবুরা। এ জনপদের তিন দিকে নদী ও এক দিকে সুন্দরবন। চারদিকে পানি থাকলেও সাহিদার মতো সুন্দরবনসংলগ্ন এ জনপদের মানুষ সুপেয় পানির জন্য বছরজুড়েই নিরন্তর লড়াই চালান।

সাতক্ষীরার শ্যামনগরে সুপেয় পানির সংকট নিরসনের দাবিতে খালি কলসি হাতে নিয়ে মানববন্ধন করেছেন এলাকাবাসী। সম্প্রতি উপজেলার মথুরাপুর গ্রামের জেলেপাড়ায়
সাতক্ষীরার শ্যামনগরে সুপেয় পানির সংকট নিরসনের দাবিতে খালি কলসি হাতে নিয়ে মানববন্ধন করেছেন এলাকাবাসী। সম্প্রতি উপজেলার মথুরাপুর গ্রামের জেলেপাড়ায়ছবি: প্রথম আলো

গাবুরার মতো শ্যামনগরের অন্য এলাকার মানুষকেও সুপেয় পানির জন্য একই রকম সংগ্রাম করতে হয়। একফোঁটা বিশুদ্ধ পানি মহামূল্যবান তাঁদের কাছে। ফাল্গুনের শুরু থেকে জ্যৈষ্ঠের মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত সংকট তীব্র হয়। অগভীর বা গভীর নলকূপ এখানে অকার্যকর। বৃষ্টি ও পুকুরের পানিই ভরসা। অনেকে টাকা দিয়ে পানি সংগ্রহে বাধ্য হন।

মানুষ বর্ষার শুরু থেকে আশ্বিনের মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত সরাসরি বৃষ্টির পানি পান করেন। এরপর কিছুদিন চলে জমিয়ে রাখা বৃষ্টির পানি দিয়ে। তবে বেশির ভাগ পরিবারের পানি জমিয়ে রাখার বড় পাত্র বা ট্যাংক নেই। কয়েক বছর ধরে বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থা (এনজিও) ও জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর (ডিপিএইচই) নামমাত্র টাকা রেখে ছোট-বড় প্লাস্টিকের ট্যাংক দিচ্ছে। তবে প্রায় সাড়ে তিন লাখ মানুষের এই উপজেলার অসংখ্য পরিবার এ সুবিধার বাইরে থেকে যাচ্ছে।

সুপেয় পানির পাশাপাশি গোসল ও গৃহস্থালির পানিরও সংকট দেখা দিয়েছে এই অঞ্চলে। গ্রীষ্মের দাবদাহ বাড়ার সঙ্গে এই সংকট আরও বাড়বে বলে আশঙ্কা করছেন স্থানীয় লোকজন। মধ্যম খলশিবুনিয়া গ্রামের শেখ সাইফুল ইসলাম বলেন, খাওয়ার পানির কষ্ট তো আছেই। এখন পুকুরগুলো সব শুকিয়ে যাচ্ছে। গোসল আর ধোয়া-মোছার পানির সংকটটাও আর বড় হয়ে দাঁড়াচ্ছে।

স্থানীয় বাসিন্দা ও জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর সূত্র বলছে, সুন্দরবনসংলগ্ন উপকূলীয় এই উপজেলায় দীর্ঘকাল ধরে সুপেয় পানির সংকট ছিল। ঘূর্ণিঝড় আইলার পর সুপেয় পানির জলাধারগুলোয় লবণপানি ঢুকে সংকট আর ঘনীভূত হয়। সুপেয় পানির সংকটের বড় কারণ লবণাক্ততা। উপজেলার বেশির ভাগ জায়গায় ভূগর্ভে পানযোগ্য পানির স্তর না পাওয়ায় গভীর নলকূপ চালু করা যায় না। বছর দশেক আগেও কিছু অগভীর নলকূপের পানি পান করা যেত। এখন অগভীর নলকূপের পানিতে মাত্রাতিরিক্ত লবণাক্ততা। আর এপ্রিলের শেষভাগ থেকে পরের তিন মাস পানির সংকট তীব্র হয়। ওই সময় পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ায় অধিকাংশ নলকূপে পানি ওঠে না।

পানি সমস্যা দূরীকরণে শ্যামনগরে জনস্বাস্থ্য বিভাগের পন্ড স্যান্ড ফিল্টার (পিএসএফ), আরডব্লিউএইচ (রেইন ওয়াটার হার্ভেস্টিং), গভীর ও অগভীর নলকূপ, আরও (রিভার্স অসমোসিস), মার (ম্যানেজ একুইফার রিসার্চ), পুকুর, দিঘি মিলিয়ে ৮ হাজারের বেশি পানির উৎস রয়েছে। উপজেলার ১২টি ইউনিয়নের মধ্যে কৈখালী, বুড়িগোয়ালিনী, পদ্মপুকুর, গাবুরা, আটুলিয়া, নুরনগর ও ইশ্বরীপুর ইউনিয়নের পানির সংকট বেশি। তবে বেসরকারি খাত ওই জনপদে কিছু সুপেয় পানির উৎস তৈরি করেছে।

শ্যামনগরের বুড়িগোয়ালিনী বেসরকারি খাত পরিচালিত নিরাপদ খাবার পানির প্রকল্প ‘প্রবাহ’ পানি প্ল্যান্টে গিয়ে দেখা যায়, সকাল থেকেই পানি নেওয়ার জন্য মানুষের দীর্ঘ সারি। তাদের কেউ কেউ দুই-তিন কিলোমিটার দূর থেকে এসেছেন। প্রতি লিটার ৩০ পয়সা দরে তারা পানি নিয়ে থাকেন। প্রবাহ প্রকল্পটি সাতক্ষীরা জেলার শ্যামনগর, আশাশুনি ও নলতা উপজেলায় মোট আটটি পানি বিশুদ্ধকরণ প্ল্যান্ট স্থাপন করেছে। যার মাধ্যমে হাজারো মানুষ উপকার পাচ্ছে।

বুড়িগোয়ালিনী ইউনিয়নের ৮ নং ওয়ার্ডের গাজীপাড়ার বাসিন্দা আবুবকর সিদ্দীক বলেন, বর্ষা মৌসুমের বাইরে অন্য ছয় মাস পানির জন্য খুবই চিন্তা করতে হতো। এই সময়ের বাইরে পুকুরের পানি পান করতেন। কিন্তু প্রবাহের পানি প্ল্যান্ট হওয়ার পর খুব সুবিধা হয়েছে। পানিবাহিত নানা অসুখ থেকে তাঁরা রেহাই পাচ্ছেন।

জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর শ্যামনগরের উপসহকারী প্রকৌশলী মোস্তাফিজুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, খরা মৌসুমে দীর্ঘদিন বৃষ্টি না হলে পুকুর-জলাধার শুকিয়ে যাওয়ায় পানির সংকট তীব্র হয়। এখানকার নলকূপ কার্যকর হচ্ছে না। আর স্থানীয় মানুষ পিএসএফ ঠিকমতো রক্ষণাবেক্ষণ করেন না। ফলে কয়েক বছরের মধ্যে পিএসএফগুলো কার্যকর থাকে না। সরকার নানাভাবে পানিসংকট সমাধানে কাজ করছে। কিছু বেসরকারি খাত ছোট পরিসরে হলেও এই সংকট নিরসনে চেষ্টা করছে।


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

© All rights reserved © 2023 satkhirachitra.com
Design & Developed BY CodesHost Limited