নদী ভাক্সগন রোধে ৩৩ জেলাকে হটস্পট ঘোষণা

0
25

ঢাকা থেকে ॥ প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও ভয়াবহ নদী ভাক্সগনের হাত থেকে দেশের ৩৩টি জেলাকে চিহ্নিত করে হটস্পট ঘোষনা করেছে সরকার। প্রকৃতির ভয়াবহতা ও বিপজ্জনক বিবেচনায় সমগ্র দেশকে ৬টি গ্রুপে ভাগ করা হয়েছে। পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের এক প্রতিবেদন থেকে এ তথ্য পাওয়া গেছে। হটস্পট চিহ্নিত করা নদী অঞ্চল ও মোহনাগুলোকে সমন্বিত ও টেকসই ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলার জন্য অভিষ্ট লক্ষ্য-ও নির্ধারণ করা হয়েছে। পাশাপাশি প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও নদীর ভাক্সগন মোকাবেলায় বাংলাদেশ ব-দ্বীপ পরিকল্পনা-২১০০-তে অন্তর্ভুক্ত করে নির্ধারণ করা হয়েছে কর্ম-কৌশল। এ কর্ম-কৌশল বাস্তবায়ন হলে নদী ও নদীর মোহনায় পানি প্রবাহের সক্ষমতা বৃদ্ধি পাবে বলে মনে করছে পানি বিশেষজ্ঞরা। পাশাপাশি নদীগুলোকে স্থিতিশীল রাখা এবং যথাযথ পলি ব্যবস্থাপনা কার্যক্রম গ্রহণ সহজ হবে বলেও মনে করছেন এ সংশ্লিস্টরা। তাদের ভাষ্যমতে, এসব পদক্ষেপে দেশে বন্যার ঝুঁকি হ্রাস পাবে। আর নদীর ভাক্সগন কবলিত এলাকায় এ পদক্ষেপের মাধ্যমে ভাক্সগন রোধ করা সম্ভব হবে । প্রতিবেদনে পাওয়া তথ্যমতে, ভৌগলিক অবস্থানগত কারণে প্রতিবছর বাংলাদেশে ব্যাপক বন্যা হয়। চলতি বছর এ বন্যা জুন থেকে শুরু হয়। এখনও অতি-বৃষ্টিপাতের কারণে বিভিন্ন জেলায় বন্যা অব্যাহত আছে। বিশেষ করে দেশের উত্তরাঞ্চলে রংপুরে রেকর্ড বৃষ্টিতে নাকাল অবস্থা সেখানকার মানুষের। টানা বৃষ্টিপাত চলছে দেশের দক্ষিণাঞ্চলের জেলা সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলায়। কর্মব্যস্ত মানুষের ঘর থেকে বের হওয়া দূরুহ হয়ে উঠেছে। পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের প্রতিবেদন তথ্য বলছে, এবার বন্যায় ৩৩ জেলা মারাত্বক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কাঁচা-ঘর বাড়ির পাশাপাশি গবাদি-পশু ও ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। এসব ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড (বাপাউবো) এবং সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসকদের সঙ্গে সমন্বয় করে দুর্যোগ মোকাবেলায় তৎপর রয়েছে সরকার। বন্যা ও নদী ভাক্সগন কবলিত মানুষের মাঝে ত্রাণ বিতরণ করেছে সরকার। এ ছাড়া দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বাপাউবোর স্প্রীডবোটের সহায়তায় ত্রাণ বিতরণ অব্যাহত আছে। মন্ত্রণালয়ের প্রাপ্ত তথ্যমতে, গত ২২ আগস্ট পর্যন্ত ৩৩ জেলার নদী ভাক্সগন কবলিত এলাকার ছয় ধরণের ক্যাটাগরিতে ক্ষতি নির্ধারণ করে জরুরি পদক্ষেপ নিয়েছে পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়। ক্ষতিগ্রস্ত ৬৩.০১ কিলোমিটার দৈর্ঘ্য নদীতীর ভাক্সগনরোধ, নদী তীর সংরক্ষণ কাজের ক্ষতি, বাঁধের ব্রীচ, বাঁধের সম্পূণ ও আংশিক ভাক্সগন এবং অন্যান্য ক্ষতিগ্রস্ত অবকাঠামো উন্নয়নে ১০৯ কোটি ১০ লাখ টাকা ব্যয় করা হয়েছে। আরও ৮৮ কোটি ৮৭ লাখ টাকা ব্যয়ে ৫৪ দশমিক ০৩০ কিলোমিটার দৈর্ঘ্য নদী তীরের মেরামত ও পুনর্বাসন কাজ চলমান রয়েছে। এ ছাড়া বন্যায় নদী ভাক্সগন রোধ, বাঁধ ও অন্যান্য অবকাঠামোর ক্ষয়ক্ষতি রোধে সার্বক্ষণিক নজরদারি বহাল রেখেছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। পাউবোর কর্মকর্তা-কর্মচারীরা প্রয়োজনীয় জিওব্যাগ ও সরঞ্জমাদিসহ চলমান মেরামত কাজেও সর্বদা নিয়োজিত রয়েছে। বন্যার পানি নেমে যাওয়ার পর ক্ষয়ক্ষতি নিরুপণ করে স্থায়ী সমাধানের উদ্যোগ নেবে সরকার। এর জন্য ২০২০-২১ অর্থবছরে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে পাউবোর বাস্তবায়নাধীন ১০১টি প্রকল্পের মধ্যে ৫৩টি নদী তীর সরক্ষণধর্মী প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে বলে মন্ত্রণালয়ের সূত্রগুলো নিশ্চিত করেছে। আগামী ২০২৩ সালের মধ্যে প্রকল্পের কাজ সমাপ্ত হবে। মন্ত্রণালয় ও পাউবো কর্মকর্তারা জানান, সারাদেশের নদী ভাক্সগ রোধ, নদী শাসন এবং নাব্যতা রক্ষাসহ সামগ্রীক নদী ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে বন্যা নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যে দীর্ঘমেয়াদী বাংলাদেশ ব-দ্বীপ-২১০০ গ্রহণ করা হয়েছে। এই নীতির আলোকে প্রাকৃতিক দুর্যোগজনিত ঝুঁকির সম্মূখীন এলাকাসমূহকে এক-একটি গ্রুপের আওতায় এনে টেকসই স্থায়ী পদক্ষেপ দিবে সরকার। এদিকে, সারাদেশে নদী ভাক্সগন মহামারী রুপ নিয়েছে। সাতক্ষীরা জেলার শ্যামনগরের দ্বীপ ইউনিয়ন গাবুরা বাঁধ ভেক্সেগ নদীর পানিতে তলিয়ে রয়েছে। ফরিদপুরের সদরপুর উপজেলার ঢেউখালী ইউনিয়নের চন্দ্রপাড়া এলাকায় আড়িয়াল খাঁ নদের ভাঙনও ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। আর শরীয়তপুরে পদ্মার ভাঙনে বিলীন হয়ে যাচ্ছে বসতবাড়ি। ভাঙন ঠেকাতে বালুর বস্তা ফেলা হয়েছে। জাজিরার উপজেলার বড়কান্দি ইউনিয়নের দুর্গারহাট এলাকা ও উপজেলার কুরেরচর ইউনিয়নের সিডার চরেও একই অবস্থা। নিঃস্ব অবস্থায় আপাতত পাশের গুচ্ছ গ্রামের উঁচু জমিতে আশ্রয় নিয়েছেন ভাক্সগন এলাকার মানুষ। পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ সচিব কবির বিন আনোয়ার এ প্রসঙ্গে বলেন, আমি যমুনা পাড়ের লোক। দুই বার আমার দাদা ও শ্বশুর বাড়ি ভাঙনের কবলে পড়েছে। আমি জানি ভাঙনকবলিত এলাকার মানুষের সমস্যা আর দুঃখ দুর্দশার কথা। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আড়িয়াল খাঁ নদের ভাঙনের রোধে উদ্যোগ নিয়েছেন। আমরা এ উদ্যোগের বাস্তবায়ন করে যাচ্ছি। আশা করছি, আগামীতে এ অঞ্চলের লোকদের আর ভাঙনজনিত সমস্যার মুখে পড়তে হবে না। এদিকে উন্নয়ন সংস্থাগুলোকে নিয়ে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় দেশের চলমান বন্যা পরিস্থিতি নিয়ে একটি যৌথ সমীক্ষা প্রতিবেদন তৈরি করেছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, বন্যায় এ পর্যন্ত ৩৩৪টি উপজেলার ৬৬ শতাংশে বেড়িবাঁধ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যে ৫৪টি ইউনিয়নে ২ থেকে ৪ কিলোমিটার পর্যন্ত বেড়িবাঁধ ভেঙে গেছে। এসব এলাকায় জরুরি ভিত্তিতে নদীর তীর রক্ষায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে প্রতিবেদনে। সিইজিআইএসের নির্বাহী পরিচালক মালিক ফিদা আবদুল্লাহ খান বলেন, প্রতি তিন-চার বছর পরপর দেশে যে বড় বন্যা হয়, এবারও তাই ঘটছে। ফলে এবার স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি সময় ধরে বন্যা স্থায়ী হয়েছে আর পানির ¯্রােতও বেশি। প্রতিবছর নদীভাঙনের যে পূর্বাভাস দেওয়া হয়, তা আমলে নিয়ে নদীপাড়ের অবকাঠামো নির্মাণ করলে বিপুল সম্পদের বিনাশ হতো না।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here