কোটি টাকার বিনিময়ে নয় জনগণের স্বেচ্ছাশ্রমেই নির্মিত হল শ্যামনগর রক্ষা কবচ রিং বাঁধ

0
52

আবু সাইদ বিশ্বাস উপকূলীয় অঞ্চল ফিরে: কোটি টাকার বিনিময়ে নয় জনগণের স্বেচ্ছাশ্রমে শ্যামনগের ভাঙন কবলিত রিং বাঁধ মেরামতের কাজ শেষ পর্যায়ে। সরকারী সহযোগীতার উপর ভরসা না থেকে টানা পঁচদিন ধরে কয়েক হাজার মানুষ অক্লান্ত পরিশ্রম উপজেলার কাশিমাড়ী ইউনিয়নের খোলপেটুয়া নদীর ঝাপালির ভাঙ্গন দিয়ে প্রাহিত পানিতে রিংবাঁধ দিয়ে পানির প্রবাহ অনেকটায় বন্ধ করে ফেলেছে। স্থানীয়রা ভাঙ্গন সংলগ্ন ঝাপালী ও ঘোলার দেড় কিলোমিটার রিংবাধ তৈরির কাজ শেষ করেছে। আগামি দু’এক দিনের মধ্যে রিংবাঁধটি শেষ হলে কালিগঞ্জ ও শ্যামনগর উপজেলার অর্ধশতাধীক গ্রামে সাগরের লোনা পানি উঠা বন্ধ হবে। ঘুর্ণিঝড় আম্ফানের ক্ষতিগ্রস্থ লাক্ষ মানুষ ফিরতে পারবে স্বাভাবীক জীবনে।

ঘুর্ণিঝড় আম্ফানে ভাঙ্গনকৃত বেড়িবাঁধ মেরামত করতে না পারায় উপকূলীয় জেলা সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার কাশিমাড়ি ইউনিয়ন পানির তলে তলিয়ে থাকে টানা একমাস। ২০ মে থেকে ৩০ মে পর্যন্ত স্থানীয়রা স্বেচ্ছাশ্রমে বাঁধ মেরামতে চেষ্টা করে। কিন্তু প্রবল জোয়ারের পানিতে সেইসব বাঁধ বেশির ভাগ ভেঙ্গে যায়। পরে তারা সরকারের উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। আশা করে দ্রুত সময়ের মধ্যে সরকারী সহযোগীতায় বাঁধ বাাঁধ মেরামত হবে। এরই মধ্যে সরকারের উচ্চপর্যায়ের কয়েটি টিম ভাঙ্গন কবলিত এলাকা পরিদর্শন করে। এমনকি সেনা প্রধান ও ভাঙ্গন কবলিত কাশিমাড়ী পরিদর্শন করেন। এর পরও ভাঙ্গনের কাজ শুরু করতে পারিনি সরকারী ভাবে। বাধ্য হয়ে ঝাপালীর প্রধান ভাঙ্গন সংলগ্ন বিলের মধ্য দিয়ে দেড় কিলোমিটার রিংবাঁধের কাজ শেষ পর্যায়ে এসেছে স্থানীয়রা। বাঁধ শেষ হলে গ্রামে পানি উঠা বন্ধ হবে। এর পর প্রধান ভাঙ্গনে টেকশই বেড়িবাঁধ নির্মান করবেন সরকার এনমটায় আশা করছেন ক্ষতিগ্রস্থরা

গত ২০ মে উপকূলীয় জেলা সাতক্ষীরার উপর দিয়ে বয়ে যাওয়া প্রলয়ংকারী ঘুর্ণিঝড় আম্ফানে ক্ষতিগ্রস্থ শ্যামনগর উপজেলার কাশিমাড়ি ইউনিয়ন। ৮২৪৭ একর ভৃমি দ্বারা বেষ্টিত ৪৩ হাজার মানুষের বসবাস ইউনিয়নটিতে। আম্ফানে ইউনিয়নটিতে ২৮ হাজার ৩৫০ জন ব্যক্তি ক্ষতিগ্রস্থ হয়। সাড়ে সাত হাজার পরিবারের মধ্যে ৩১শ পরিবার চরম ক্ষতিগ্রস্থ হয়। ৭৪০টি বাড়ি পানির তলে এবং ৮৩০টি বসতবাড়ি আংশিক ক্ষতিগ্রস্থ হয়। ঝড়ে নদী বেষ্টিত ইউনিয়নটির ৭ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ ক্ষতিগ্রস্থ হয়। ২ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ ভেঙ্গে ইউনিয়নটির দুইতৃতীয়াংশ প্লাবিত হয়। খোলপেটুয়া নদীর ঝাপালি নামক স্থানে বেড়িবাঁধের সবচেয়ে বড় ভাঙ্গন সৃষ্ট হয়। এতে নদী সংলগ্ন ঘাপালি গ্রামের প্রধানসড়ক ভেঙ্গে ৪-৫ ফুট উচ্চে পানির প্রাবাহ সৃষ্টি হয়। স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ সূত্র এমন তথ্য জানায়।
স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ সূত্র আরো জানায়, ঝড়ে ইউনিয়নটিতে ৫৫ কিলোমিটার বিদ্যুৎ বিচ্ছন্ন হয়ে যায়,৪৫টি মসজিদ,২১টি মন্দির ক্ষতিগ্রস্থ হয়। ২১ কিলোমিটার পাকা রাস্তা, ৫৫ কিলোমিটার আধা পাকা রাস্তা,৩টি ব্রিজ,১৫টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান,৫৪৪টি নলকূপ,৭হাজার স্বাস্থ্য সম্মত পায়খানা,সাড়ে ৫শ মিঠা পানির পুকুরের মধ্যে ১০ পুকুর,৪৫টি গভীর নলকূপসহ বিভিন্ন উন্নয়ন ও প্রকল্প নষ্ট হয়ে যায়। স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের সচিব আব্দুস সবুর জানান,তার ইউনিয়নের ঘুর্ণিঝড় আম্ফানে ক্ষতির পরিমাণ আনুমানিক ২১ কোটি ৭৬ লক্ষ ৯ হাজার টাকারমত।

স্থানীয় ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি আজিজুল হক সরদার জানান, মানুষ সরকারী সহযোগীতার উপর ভর না করে জীবন যুদ্ধে টিকে থাকতে নিজেরা স্বেচ্ছা শ্রমে রিংবাঁধ দিয়ে গ্রামে পানি প্রবেশ বন্ধ করছে।

সাবেক ছাত্র নেতা রুহুল আমিন জানান, আম্ফানে ক্ষতি গ্রস্থের পর সরকারি ভাবে আশ্বাস দিলেও এখনো পর্যন্ত বেড়িবাঁধ নির্মাণ করা সম্ভব হয়নি। ফলে এখানকার মানুষ গুলো মানবেতর জীবন যাপন করছে। তার নের্তৃত্বে কয়েকশ ছাত্র কাশিমাড়ীতে রাত দিন পরিশ্রম করে যাচ্ছে। প্রতিদিন ভাটার সময় তারা রিংবাঁধ তৈরি করছেন।

প্রভাষক আব্দুল জলিল জানান, এখানকার মানুষের সীমাহীন দুখ কষ্ট বর্ণানাতীত। বার বার আশ্বাসের পরও সরকারী সহযোগীতা অপ্রতুল্য। মানুষেরে বেঁচে থাকার মত তেমন কিছুই নেই। গোটা উপজেলা থেকে তার নের্তৃত্বে শত শত মানুষ গত পাঁচ দিন ধরে ঝাপালির রিংবাঁধে কাজ করছেন। তিনি তাদেরকে যাতায়া ও খাওয়ার ব্যবস্থা করেছেন।

স্থানীয় আসনের সাবেক জাতীয় সংসদ গাজী নজরুল জানান, মানুষের পাশে তার দল সব সময় ছিল। আছে এবং আগামিতে থাকবে। তার দলের নেতা কর্মীদের পকেটের টাকায় রিং বাঁধের কাঠ,বাঁশ প্রেকসহ বিভিন্ন সরাঞ্জন কেনা হয়েছে। বেশির ভাগ স্বেচ্ছা শ্রমিকও তার দলের। ঘূণিঝড় আম্ফানের শুরু থেকে তার দল ক্ষতিগ্রস্থ মানুষের পাশে ছিল। গোটা উপজেলা থেকে এক মাত্র তাঁর দলীয় নেতাকর্মীরা ক্ষতিগ্রস্থ মানুষের পাশে এসে দাঁড়িয়ে আতœমানবতার সেবায় এগিয়ে আসে।

স্থানীয় আওয়ামীলীগের সাধারণ সম্পাদক প্রভাসক এসএম আবুল হোসেন জানান, ঘুর্ণিঝড় আম্ফানের পর তার দল ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানকে সাথে নিয়ে সরকারের বিভিন্ন মহলের সাথে দেন দরবার করেন। সাধারণ মানুষের পাশে নিয়ে স্থানীয় আওয়ামীলীগের বিভিন্ন অঙ্গসংগঠন ক্ষতিগ্রস্থদের পাশে দাঁড়ায়। রিংবাঁধসহ বিভিন্ন সেবামূল কাজ করে যাচ্ছে।

কাশিমাড়ী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান এসএম আব্দুর রউফ জানান, ঘূণিঝড় আম্ফানের পর থেকে ইউনিয়নবাসি তার পাশে এসে দাড়িয়েছে। তিনি সকল পর্যায়ের মানুষের সাথে নিয়ে ভাঙ্গন কবলিত এলাকায় রিংবাঁধ দিয়ে গ্রাম রক্ষার কাজ করছেন। তিনি জানান, যে ভাবে স্বেচ্ছা শ্রমে রিংবাঁধ নির্মান এগিয়ে চলেছে তাতে দু’এক দিনের মধ্যে গ্রামে নদীর পানি উঠা বন্ধ হবে।

কাশিমাড়ীর খোলপেটুয়া নদীর বাঁধ ভেঙ্গে প্লাবিত সড়কের উপর সাঁকো নির্মাণ করে পথচারীদের চলাচলে স্বস্থি ফিরি এসেছে। ঘূর্ণিঝড় আম্পানে খোলপেটুয়া নদীর কাশিমাড়ীর ঝাপালী অংশের পাউবোর বেড়িবাঁধ ভেঙ্গে কাশিমাড়ীসহ পার্শ্ববর্তী কালিগঞ্জের কৃষ্ণনগর ইউনিয়নের অনেক গ্রাম, খাল বিল, পথঘাট, ঘরবাড়ি ও মৎস্য ঘের প্লবিত হয়। শ্যামনগর-ঝাপালী সড়কের (মেইন রোড) একাধিক স্থান পানিতে তলিয়ে যায়। মেইন রাস্তার উপর দিয়েও পানি জোয়ার-ভাটা প্রবাহিত হচ্ছে। এতে পিচের রাস্তার ছাল ছামড়া উঠে গিয়ে বড় বড় খানা খন্দের সৃষ্টি হওয়াসহ চরম ভোগান্তিতে পড়ে পথচারীরা। এরই মধ্যে ইউনিয়নবাসির সহযোগীতায় স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানের উদ্যোগে সড়কের উপর একটি বাশের সাঁকো নির্মাণ করা হয়।

শ্যামনগর উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) আনম আবুজর গিফারী বলেন, ঘুর্ণিঝড় আম্ফানের পর থেকে কাশিমাড়ী ইউনিয়নে ৩৯ মে:টন সরকারী চাল ও নগত অর্থ বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। স্বেচ্ছা শ্রমের ভিত্তিতে যারা কাজ করছে তাদের খাবার বাবদ এই চাল ব্যয় করার কথা। তবে সরকারী ভাবে এখনো পর্যন্ত বেড়িবাঁধ মেরামতও সংস্কার বাবদ কোন বরাদ্ধ কাশিমাড়ীতে দেয়া হয়নি। বরাদ্দ পেলেয় দেয়া হবে।
স্থানীয় এম,মপি,উপজেলা চেয়ারম্যানসহ বিভিন্ন পর্যায়ের জনপ্রতিনিধিগণ জনগণের স্বেচ্ছাশ্রমে দেয়া রিংবাঁধ নির্মানে উৎসাহ যোগাচ্ছে বলে স্থানীয়রা জানান।
আবু সাইদ বিশ্বাস: সাতক্ষীরা: ১৯/০৬/২০২০

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here